প্রবাসীআয়ে টান পড়েছে

প্রবাসী-আয় বা রেমিট্যান্স কমে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) প্রবাসী-আয় বা  রেমিট্যান্স আগের তুলনায় বাড়েনি, বরং কমেছে। এ সময়ে প্রবাসী শ্রমিকেরা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ কোটি ডলার কম অর্থ পাঠিয়েছেন। এই ১০ মাসে প্রবাসী-আয় কমেছে ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থনীতির আস্থার সূচক প্রবাসী-আয়ে মন্দা ভাব চলছে। তবে প্রবাসী-আয় কমলেও রপ্তানি-পরিস্থিতি ভালো থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েনি। তবে অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে অন্যত্র। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, প্রবাসী-আয় কমে যাওয়ায় জাতীয় ভোগ কম হবে, যা বছর শেষে  মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে মোট প্রবাসী-আয় এসেছে ১ হাজার ২২৫ কোটি ডলার। গত বছর একই সময়ে এসেছিল ১ হাজার ২৫৫ কোটি ডলার। গত এপ্রিল মাসে ১১৯ কোটি ডলার এসেছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৯ কোটি ডলার কম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রবাসী-আয় বেসরকারি খাতের ভোগ বাড়াতে যথেষ্ট মাত্রায় সহায়তা করে। জিডিপি গণনায় একটি বড় অংশই আসে বেসরকারি খাতের ভোগ থেকে। তাই প্রবাসী-আয় নেতিবাচক হলে বছর শেষে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, ‘সাধারণত দারিদ্র্যসীমার একটু ওপরের মানুষই প্রবাসী-আয় বেশি পান। এখন যদি প্রবাসী-প্রবাহ কমে যায়, তবে ওই শ্রেণির মানুষের আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবাসী-আয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১০ কোটি ডলার কম এসেছে। এরপর গত ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবাসী-আয় কখনো নেতিবাচক, কখনো ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ছিল। মূলত ওই সময়ে দুটি ঈদ উৎসব ছিল, তাই রেমিট্যান্স কিছুটা বেশি এসেছে। কিন্তু গত জানুয়ারি মাস থেকে সেই ধারাবাহিকতা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। গত চার মাসের (জানুয়ারি-এপ্রিল) প্রতি মাসেই আগের বছরের তুলনায় কম অর্থ এসেছে।
গত এপ্রিলে সরকারি খাতের সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী-আয় এসেছে ৩৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। বেসরকারি খাতের ৩৯টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৮০ কোটি ৭১ লাখ ডলার। বিদেশি খাতের ৯টি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ৩০ কোটি ৪২ লাখ ডলার।
প্রবাসী-আয় কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব শ্রমিক যাচ্ছেন, তার বড় একটা অংশ নারীকর্মী। পুরুকর্মীদের তুলনায় নারীকর্মীর আয় কম, ফলে জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও রেমিট্যান্স বাড়ছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি যাওয়ার কারণে প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোতে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাসনিম সিদ্দিকী আরো বলেন, সিঙ্গাপুরে জঙ্গি সন্দেহে বাংলাদেশি আটকের ঘটনা সংকেতপূর্ণ। এটা প্রবাসীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে পারে। আমাদের জনশক্তি রপ্তানির সময় যাচাই-বাছাই করেই পাঠানো উচিত।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুদ্ধের কারণে লিবিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীদের আয় কমে গেছে। নতুন কওে কোনো শ্রমিকও আর যেতে পারছেন না। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে লিবিয়ার দিনারের মূল্য কমে যাওয়ায় তাঁদের প্রকৃত আয়ও কমে গেছে। ফলে লিবিয়া থেকে রেমিট্যান্স আসা প্রায় শূন্যেও কোটায় চলে গেছে। আবার যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত ছাত্রদেও মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা দেশে ফেরত আসছেন। নতুন করেও সেভাবে যেতে পারছেন না। এ ছাড়া অবৈধভাবে থাকা প্রবাসীরাও চলে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। সিঙ্গাপুরে থাকা প্রবাসীরাও স্বস্তিতে নেই।
প্রথম আলোর সৌজন্যে

 

share this news to friends