মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-১৭

মানবপাচার একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা। মানবপাচারকারীরা আন্তর্জাতিক সংঘবদ্ধ চক্রের সাথে জড়িত। মানবপাচার কেবল একটি জঘন্য অমানবিক অপরাধই নয়, এর ফলে পাচারের শিকার ব্যক্তির মানবিক মর্যাদার চরম অবমাননা ঘটে। অন্তঃসীমান্ত মানবপাচার অপরাধ একটা বিশাল বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। নারী, পুরুষ এবং শিশু নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ এর শিকার হচ্ছে। আজকের সময় মানবপাচার এতটাই অমানবিক ও নির্দয় হয়েছে যে একে ‘‘আধুনিক দাসপ্রথা’’ বলা হচ্ছে। মানবপাচারের ভয়াবহতার কারণে অনেক দেশ মানবপাচার রোধে একত্রিত হয়েছে। মানবপাচারের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক পদক্ষেপের ফলেশ্রুতিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে আইনি দলিল এবং জাতীয় পর্যায়ে আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা এসেছে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে পরিকল্পনা একান্ত জরুরি। একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনভাবেই মানবপাচার রোধ সম্ভব নয়। আমাদের দেশেও মাবনপাচারের ভয়াবহতা এতটাই প্রকট হয়েছে যে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়া কোন উপায় নেই। সরকার মানবপাচার রোধে  বিভিন্ন সময় নানা ধরনের উদ্যোগ ও কৌশল গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে আইন প্রণয়ন করাসহ বিভিন্ন মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ। ইতোমধ্যে সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে কর্মপরিকল্পনা  ২০১২-১৪ এর কার্যক্রম শেষ করে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-২০১৭ এর কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে ধারাবাহিক কমসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। নব প্রনীত আইন বাস্তবায়ন, বিভিন্ন কমিটি এবং বিভিন্ন উৎসাহমূলক, প্রতিরোধমূলক ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির কারণে এবং ইতোমধ্যে অর্জিত সাফল্যেও ধারাবাহিকতায় ২০১২-১৪ মেয়াদে বাংলাদেশ মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।

মূলতঃ জাতিসংঘের শিশু সনদের অঙ্গীকার পূরণার্থে বাংলাদেশ সরকার ২০০২ সালে পাচারসহ শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়ন এবং শোষণের বিরুদ্ধে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ২০০২ সালের ঐ কর্মপরিকল্পনার মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর এটি মহিলা ও শিশু  বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গৃহীত মানবপাচার বিরোধী এক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল। নারী ও শিশু পাচার বিরোধী একটি পরিপূর্ণ নীতি ২০০৮ সালে প্রণীত হয়। ২০০৮-২০১১ মেয়াদের এই মধ্য- মেয়াদী কর্মসূচির একটি বড় দূর্বলতা ছিল এতে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পাচারকে কর্মপরিকল্পনার আওতাভূক্ত করা হয়নি। এতে কোন তদারকি মূল্যায়ণ বা প্রতিবেদন দেয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। আগের সেই কর্মপরিকল্পনার মেয়াদ সবে শেষ হয়েছে। পাশাপশি প্রথমে ২০১১ সালে এবং পরে ২০১২ সালে নতুন একটি পাচার বিরোধী সমন্বিত আইন হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এ সংক্রান্ত অনেক পরির্বতন এসেছে; অগ্রগতিও হয়েছে। এসব মিলে সব ধরনের মানবপাচার দমন ও ভিকটিমদের  সুরক্ষার জন্য ২০১২ সালে একটি নতুন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এই পরিকল্পনার মেয়াদকাল শেষ হওয়ার প্রাক্কালে, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনকল্পে গৃহীত কর্ম-উদ্যোগ বেগবান ও চলমান রাখতে এবং মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২’র পূর্ণাঙ্গ  বাস্তবায়ন নিশ্চিত কল্পে আবারও একটি জাতীয় কর্ম পরিকল্পপনা প্রণয়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ সালে মানবপাচার প্রতিরোধে কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটিসমূহের কার্যক্রম তদারক ও মনিটরিং এর জন্য জাতীয় কর্ম-পরিকল্পনা ২০১২-১৪ এর নির্ধারিত বিষয়বস্তু ও সময়ভিত্তিক কর্ম বাস্তবায়ন মনিটনিং সভায় ২০১৫-১৭ মেয়াদে একটি নতুন জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে এ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।

মানবপাচার অপরাধ সংঘটনে মানবাধিকারের গুরুত্বর লঙ্ঘন হয়, এ কথা বিবেচনায় রেখে মানবপাচার দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫ লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, শিক্ষা, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সম্পদের ভিত্তিতে কোন ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য না করা; সরকারের দায় এবং কর্তৃত্ব; পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার; পুর্নবাসন ও উদ্ধার এবং ফৌজদারি মামলার কার্যক্রম চলাকালে শিশু ভিকটিমের সর্বোচ্চ স্বার্থ সংরক্ষণ, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে কাজ করা; স্থানীয় পর্যায়ে লোকজন এবং স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ; সরকারের নিজস্ব বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এবং সরকারি আর অন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়; সরকারের বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্যতা এবং আন্তর্জাতিক সমাজ ও উদ্যোগ গুলোর সাথে বাংলাদেশের একাত্মতা এ সকল নীতিসমূহের উপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-১৭ এর মলূ লক্ষ্যসমূহ হলঃ মানবপাচার দমনে এবং ভিকটিমদের রক্ষায় বাস্তবায়নযোগ্য একটি কর্মসূচি প্রদান এবং এ কর্মসূচির কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন এবং প্রচলিত আইনের ব্যবহার ও প্রয়োগের তত্ত্বাবধান।

মানবপাচার প্রতিরোধ, সচেতনতা এবং জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি; পাচারের শিকার ও বেঁচে যাওয়া/উদ্ধারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা; মানবপাচার অপরাধের বিচার; যৌথ অংশীদারিত্ব,অংগ্রহণ, সমন্বয় ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় যৌথ আইনি সহায়তার ক্ষেত্র গড়ে তোলা এবং তদরকি, মূল্যায়ণ এবং প্রতিবেদন প্রদান বিষয়ক একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই  এই কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-১৭ এর কর্মকা-। এ কর্মকা- সমূহ বাস্তবায়নে নেতৃত্ব প্রদান করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-১৭ বাস্তবায়নে প্রয়োজনেই নেতৃত্বেও জায়গায়টিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রাণলয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও স্থান দেয়া হয়েছে। এছাড়াও তথ্য মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, বিজিবি, বাংলাদেশ আনসার, কোষ্টগার্ড, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, এটর্নি জেনারেলের দপ্তর, বিচার প্রশাসন, প্রশিক্ষন ইনিষ্টিটিউট, আইন কমিশন, বিদেশস্থ সকল মিশন, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থ্পনা মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, এনজিও ব্যুরো, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক (মানিলন্ডরিং ইউনিট),  বিএমইটি (জনশক্তি, বৈদেশিক ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো), স্থানীয় সরকার প্রশিক্ষণ একাডেমি, ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বায়রা (বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস), এ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল ফোন অপারেটরস, এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকারস, বিজিএমই, বিটিএমসি, বিকেএমএ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, গ্রামীণ ব্যাংক, জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট সংস্থা ( আইওএম, আইএলও, ইউএনডিপি এবং ইউনিসেফ, ইউএন উইম্যান প্রভৃতি) এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও (ব্রাক, বিএনডব্লিউএলএ, সিডব্লিউসিএস, এসিডি, টিএমএসএস, রাইটস যশোর, ইনসিডিন বাংলাদেশ, এ্যাটসেক বাংলাদেশ এবং উইনরক ইন্টারন্যাশনাল প্রভূতি) সংস্থাসমূহকে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-১৭ এর বাস্তবায়ন দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এবং দায়িত্ব নিতে বলা হয়েছে।

সরকার নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১, শিশু-শ্রম নিরসন নীতি- ২০১০ এবং শিশু অধিকার নীতি-২০১১ প্রণয়ন করেছে। এ নীতিগুলো মানবপাচার বিরোধ কর্মকা-ে জোর ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে নারী নীতি-২০১১ এবং শিশু অধিকার নীতি-২০১১ খুবই স্পষ্ট করে নারী ও শিশু পাচার বন্ধে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। এছাড়াও মানবপাচার রোধে সরকার জাতীয় পর্যায়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি এবং জেলা কমিটি গঠন; মনিটরিং সেল গঠন; চলমান সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি; পাচার হওয়া নারী ও শিশু উদ্ধার সংক্রান্ত (আর.আ.আর.আই) টাস্কফোর্স; পাচারের শিকার শিশুর প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আদর্শ কর্মপরিচালনা পন্থা (এস.ও.পি); মানবপাচার পরিস্থিতি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন; প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রালয়য়ের ভিজিল্যান্ট টাস্কফোর্স; আইন সংস্কার; মানবপাচার অপরাধের বিচার ওঅপরাধীদের তথ্য মূল্যায়ণ তথ্যভা-ার; অপরাধ তদন্তে আর্দশে কর্মপরিচালনা পন্থা (এস.ও.পি) এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে। মানবপাচার একটি জঘন্য সংঘবদ্ধ অপরাধ। এর সাথে দেশি বিদেশি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে সরকারের সকাল কার্যক্রমকে বাস্তবায়ন করতে দেশের প্রতিটি মানুষের সচেতনতা ও কার্যকর ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১৫-১৭ একটি গুরুত্ব কার্যক্রম। এর সঠিক বাস্তবায়নই পারে মানবপাচারের মত জঘন্য অপরাধ রোধ করতে।

মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, তথ্য অফিসার

তথ্য অধিদফতর, ঢাকা

share this news to friends