বিশ্ব শরণার্থী দিবস ও তাদের অধিকার

শরণার্থী ইস্যুটি বর্তমান বিশ্বে একটি চলমান সমস্যা। শরণার্থীদের নির্দিষ্ট দেশ নেই। অস্থায়ী ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয় তারা। অবহেলা আর বঞ্চনায় কাটে জীবন। শরণার্থীদের অধিকার নেই বললেই চলে। তবে অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই তাদের জীবনেও স্বপ্ন আছে, পরিকল্পনা আছে। শুধু যে নিজেকে নিয়ে তা নয়, পরিবার, ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবে তারা। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের রয়েছে নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, মৌলিক ও মানবিক অধিকার। কিন্তু বিশ্বের অনেক স্থানেই আজ শরণার্থীদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে। তাই আন্তর্জাতিক পরিম-লে শরণার্থীদের অধিকার বাস্তবায়নে বহুবিধ আলোচনা হচ্ছে।

ইউনাইটেড নেশনস হাইকমিশন ফর রিফিউজিস (UNHCR) এর হিসেবে, বিশ্বের মোট শরণার্থীর সংখ্যা ১৯.৫ মিলিয়ন যার মধ্যে ১৮ বছরের কম ৫১ শতাংশ, ১৮-৫৯ বছর বয়সি ৪৬ শতাংশ এবং ৬০ বছরের উপরে ৩ শতাংশ। এছাড়া বিশ্বব্যাপী বলপূর্বক গৃহহীন করা হয়েছে প্রায় ৫৯.৫ মিলিয়ন মানুষকে এবং স্টেটলেস রয়েছে ১০ মিলিয়ন। বিশ্বের ৫৩ শতাংশ শরণার্থী এসেছে সোমালিয়া, আফগানিস্তান এবং সিরিয়া থেকে। দেশগুলোত যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে এত লোক শরণার্থী।

বেশ কিছু সংস্থা শরণার্থীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে UNHCR। বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের নানা সমস্যার সমাধান ও অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করছে সংস্থাটি। সংস্থাটির মতে,  তুরস্ক, পাকিস্তান, লেবানন, ইরান, ইথিওপিয়া এবং জর্ডানে ৬.৫৪ মিলিয়ন নিবন্ধিত শরণার্থী রয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশেও ৩১ হাজার ৭শত ৫৯ জন নিবন্ধিত শরণার্থী আশ্রয় গ্রহণ করেছে। তবে অনিবন্ধিত শরণার্থী সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। শরণার্থীদের অধিকার রক্ষা করবে প্রত্যেকটি আশ্রয় প্রদানকারী দেশ, এটাই নিয়ম। UNHCR এর অনুচ্ছেদ ১৪ (১) এ বলা আছে, প্রত্যেকেরই নিগ্রহ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্য দেশে আশ্রয় প্রার্থনার অধিকার রয়েছে। শরণার্থী বিষয়ক মূল আইন হলো শরণার্থীর মর্যাদা বিষয়ক কনভেনশন ১৯৫১ এবং ১৯৬৭ সালের শরণার্থী প্রটোকল। ১৯৬৭ সালের প্রটোকল অনুযায়ী শরণার্থী সেই ব্যক্তি; যিনি জাতি গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, জাতীয়তা, নির্দিষ্ট সামাজিক সংগঠনের সদস্যপদ বা রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে নিজ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং নিজ দেশের নিরাপত্তা পেতে অপারগ অথবা অনিচ্ছুক বা নিগ্রহে ভীতির কারণে সেখানে ফেরত যেতে চান না। শরণার্থী রক্ষাণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ অধিকার জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (UDHR) মূল অধিকারগুলোর মধ্যেই ছিল। এগুলো হচ্ছে ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার; আশ্রয় প্রার্থনা ও পাওয়ার অধিকার; অত্যাচার অথবা নিষ্ঠুরতা, অমানবিক বা মর্যাদা হানিকর ব্যবহার বা শাস্তি থেকে মুক্তি; দাসত্ব বা দাসত্ববন্ধন থেকে মুক্তি; আইনের সামনে একজন ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি; চিন্তা-চেতনা ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা; অবৈধ যাত্রা ও আটকাবস্থা থেকে মুক্তি; ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন এবং বাড়িতে অবৈধ অনুপ্রবেশ থেকে মুক্তি; মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা; শিক্ষা পাওয়ার অধিকার এবং সমাজের সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার।  

শরণার্থীদের অধিকার সুরক্ষায় বড়ো মাধ্যমটি হলো ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন এবং ১৯৬৭ সালের প্রটোকলের সঠিক ব্যবহার। এছাড়া ১৯৪৮ সালের UDHR এর ঘোষণার বাস্তবায়ন। বর্তমান বিশ্বের ১৯.৫ মিলিয়ন আবাসচ্যূত লোকের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত জরুরি। UNHCR শরণার্থী অধিকার বাস্তবায়নের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শরণার্থীদের অধিকার ফিরে পাওয়ার মাধ্যম হচ্ছে নিরাপদ আবাসস্থল, জাতি পরিচয় এবং এর পাশাপাশি মৌলিক অধিকার ফিরে পাওয়া।

UNHCR ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফিল্ম নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে শরণার্থীদের ন্যূনতম আবাসন, খাদ্য, পানীয় এবং স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হবে। শরণার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন এবং ১৯৬৭ সালের প্রটোকল অনুসারে রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিজ দেশে বসবাসরত শরণার্থীদের অধিকার সংক্রান্ত সব দলিলপত্র প্রদান করা হয়েছে। কনভেনশনে অনুচ্ছেদ-৩৫ এবং প্রটোকল অনুচ্ছেদ-২ এ উল্লেখ আছে- একটি অঙ্গীকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রদ্বয়কে ইউএন শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, যেখানে এর কার্যাবলি এবং তত্ত্বাবধানের জন্য শর্তাবলি বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কনভেনশন এবং প্রটোকলের দলিল সর্বাধিক ন্যায়সঙ্গত, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শরণার্থীদের জন্য আইনগত স্ট্যাটাস গ্রহণ করা হয়েছে।  

শরণার্থী রয়েছে এমন দেশের তালিকায় বাংলাদেশও অন্যতম। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩১ হাজার ৭ শত ৫৯ জন নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে যারা মূলত মিয়ানমার থেকে আগত। এরা ১৯৯১-৯২ সালের দিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অত্যাচারের ফলে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আসে। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার নয়াপাড়া ও উখিয়া উপজেলার কুতুপালং এলাকায় শরণার্থী শিবিরে এদের অবস্থান। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বাংলাদেশের কক্সবাজারের কয়েকটি এলাকা শরণার্থীদের ভারে জর্জরিত হয়ে আছে। বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও একে ছোটো করে দেখার অবকাশ নেই। প্রতিবেশী হিসেবে এবং আঞ্চলিক আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মিয়ানমার বাংলাদেশ জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। তাই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত।

দিন যতই যাচ্ছে সারা বিশ্বের শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। পৃথিবীতে যুদ্ধ-বিগ্রহ, সীমান্ত নীতির সমস্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। আর সেই সহিংসতার শিকার হয়ে সাধারণ অনেক মানুষ শরণার্থী হচ্ছে। বিশ্বের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে টেকসই  উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (SDG) অর্জন সম্ভব নয়। তাদের জন্য মৌলিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরাপদ আবাসস্থল, জাতি-পরিচয় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে যেন সাধারণ মানুষ শরণার্থী না হয় সে বিষয়টি বিশ্ববাসীকে নিশ্চিত করতে হবে।

১৯৫১ সালের শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০১ সাল থেকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালন হয়ে আসছে। ২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৫৫/৭৬ ভোটে অনুমোদিত হয় যে, ২০০১ সাল থেকে জুন মাসের ২০ তারিখ আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করা হবে। যদিও ২০০০ সাল পর্যন্ত ‘আফ্রিকান শরণার্থী’ দিবস নামে একটি দিবস বিভিন্ন দেশে পালিত হয়ে আসছিল। জাতিসংঘ পরবর্তীকালে নিশ্চিত করে যে, অর্গাইজেশন অব আফ্রিকান ইউনিটি (OAU) ২০ জুনকে ‘আফ্রিকান শরণার্থী’ দিবস এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করতে সম্মত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের অমানবিক অবস্থানের প্রতি আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের সচেতনতা সৃষ্টির জন্য দিবসটি পালন করা হয়। আর সেই সাথে শরণার্থীদের অধিকার রক্ষার বিষয়টিকেও মনে করিয়ে দেওয়া হয়। UNHCR বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের নানা সমস্যা সমাধান ও অধিকার বাস্তবায়নে যেমন কাজ করছে তেমনি ‘বিশ্ব শরণার্থী’ দিবসকে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে রাষ্ট্রসমূহকে শরণার্থীদের প্রতি আরো সংবেদনশীল ও মনযোগী হওয়ার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।

পিআইডি ফিচার

share this news to friends