ডিজিটাল বাংলাদেশ ও প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার

আধুনিক যুগ বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। বিজ্ঞানের গৌরবময় ভূমিকার জন্যই বিশ্বসভ্যতা আজ উন্নতির শীর্ষে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের বিকল্প নেই। তাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সরকার জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সরকারি সকল কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তি হিসেবে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’স্লোগানকে সামনে রেখে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ‘দিন বদলের সনদ’-এ প্রথমবারের মতো ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটি জাতির সামনে তুলে ধরা হয়। এ ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও লাগসই ব্যবহার। ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পেলে সরকারি সেবা দ্রæততার সাথে স্বল্প খরচে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যাবে। সকল ধরনের তথ্যে জনগণের অভিগমন (Access) সম্ভবপর হবে, কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। সরকারের নীতি-পরিকল্পনা গ্রহণে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ার সাথে সাথে দুর্নীতি কমে আসবে। মানব সম্পদ উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনও সম্ভব হবে।

রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী তথ্য-প্রযুক্তি খাত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যআয়ের দেশে উন্নীত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। রূপকল্প ২০২১, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ও জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর সাথে সঙ্গতি রেখে দেশের যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সুবিধার সহজ প্রাপ্তি এবং ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হলে উন্নয়নের সকল ধারায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বর্তমান সরকার ই-গভর্নেন্স, ই-শিক্ষা, ই-বাণিজ্য এবং ই-সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। এই চারটি ক্ষেত্রে সরকারের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি; মানব সম্পদ উন্নয়ন; দেশীয়/ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং সরকারের সেবাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে।

সরকারি সেবাসমূহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে ই-সেবার মাধ্যমে নানাবিধি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় সহজে, দ্রæত ও সুলভে সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি এবং বাণিজ্যিক তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার সমন্বিত উদ্যোগ হিসেবে ৪,৫৪৭টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৩২১টি পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশনের ৪০৭টি ওয়ার্ডে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবাকেন্দ্র (UISC)/ ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ১০২টির অধিক সরকারি-বেসরকারি সেবা কেন্দ্র থেকে নাগরিকদের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল সেন্টারে যুক্ত হচ্ছে এবং প্রতিমাসে প্রায় ৪৫ লক্ষেরও বেশি প্রান্তিক জনগণকে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদান ছাড়াও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও আনইগত সেবা, অনলাইন জন্ম-নিবন্ধন, বিদেশ গমনেচ্ছু শ্রমিক ও পেশাজীবীদের অনলাইন নিবন্ধন, ইউটিলিটি সার্ভিসের বিল প্রদানসহ নানা ধরনের সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

সরকারের এসব উদ্যোগ শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৪ সালে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা-ক্যাটাগরিতে আন্তর্জাতিক সম্মাননা ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি” পুরস্কার অর্জন করেছে ডিজিটাল সেন্টার। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রামের ‘জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ একসেস টু ইনফরমেশন এন্ড নলেজ ক্যাটাগরিতে মনোনীত হয়ে ‘‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি’’ পুরস্কার অর্জন করে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আলোকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্দেশ্যে সরকার ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৮টি মন্ত্রণালয়/ বিভাগে সেবা পদ্ধতি সহজীকরণ ও ই-সেবা বাস্তবায়নের লক্ষে প্রায় ৩ হাজার সরকারি দপ্তরে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আরও ১৯ হাজার সরকারি দপ্তরে ই-ফাইল বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টায় আর একটি নতুন সংযোজন হলো ‘‘প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার”। প্রবাসে কর্মরত কর্মীদের সেবা প্রদানে ‘প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার” একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখছে। সেই প্রবাসী বন্ধুদের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ার জন্য এখন থেকে ‘‘প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার’’ কাজ করবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের a2i প্রকল্পের কারিগরি সহযোগিতায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার স্থাপন করে। এ কল সেন্টারের মাধ্যমে প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা তাদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত, মৃতদেহ আনয়ন ও আর্থিক অনুদান, ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বেতনের অর্থ প্রাপ্তি বিষয়ক তথ্য; প্রবাসী কর্মীর মেধাবী সন্তানদের শিক্ষা বৃত্তি প্রদান তথ্য; দূতাবাসের মাধ্যমে প্রবাসী কর্মীদের আইনগত সহায়তা সম্পর্কিত তথ্য ও সেবা; অসুস্থ, আহত অথবা পঙ্গু কর্মীদের দেশে ফেরত আনা ও আর্থিক সাহায্য সম্পর্কিত তথ্য ও সেবা এবং প্রবাসে আটকে পড়া কর্মীদের মুক্তকরণ সম্পর্কিত তথ্য ও সেবা নিতে পারবেন। অর্থ্যাৎ প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা এখন থেকে তাদের যে-কোনো সমস্যায় তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে সরাসারি ফোন করতে পারবেন এবং সমাধান পাবেন।

প্রথম পর্যায়ে জর্ডান, মালয়েশিয়া ও সৌদিআরবে কর্মরত প্রায় ২৫ লক্ষের অধিক বাংলাদেশি কর্মী এ কল সেন্টারের সুবিধা পাবেন। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরাও এ সুযোগ পাবেন। প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য +৮৮০৯৬৫৪৩৩৩৩৩৩ নম্বরটি বাংলাদেশ সময় সকাল ৯.০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬.০০টা পর্যন্ত চালু থাকবে। এ ছাড়া প্রবাসীরা ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার, ইমো, হোয়াটস অ্যাপে +৮৮০১৬৭৮৬৬৮৮১৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন। ফেসবুকে যোগাযোগ করা যাবে

www.facebook.com/probashbondhucallcenter -এ ঠিকানায়। আর ই-মেইল ঠিকানা probashbondhu.wewb@gmail.com ।

রূপকল্প ২০২১ এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক দিয়ে এক অনন্য উচ্চতায় স্থান করে নিতে সক্ষম হবে। সরকার ইতোমধ্যে রূপকল্প ২০৪১ ঘোষণা করেছে এবং এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যআয়ের পর্যায় পেরিয়ে শান্তিপূর্ণ, সুখীসমৃদ্ধ এক উন্নত জনপদে পরিণত করার অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন সরকারের সমন্বিত প্রয়াস, আইনি কাঠামো, সুনির্দিষ্ট এজেন্ডার অগ্রাধিকার, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের মানসিকতাসম্পন্ন একবিংশ শতাব্দীর উপযুক্ত দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা।

বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা আজ শুধু স্বপ্ন নয়, এ এক বাস্তবতা। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে মধ্যআয়ের একটি দেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার দ্বারপ্রান্তে আমরা উপনীত। সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

(পিআইডি ফিচার)

লেখক : মো: জাহাঙ্গীর আলম, জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়

share this news to friends