‘উন্নয়নের মহাসড়কে অভিবাসীরা সবার আগে’

জনশক্তি রপ্তানি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মসংস্থান শুধু দেশের বেকারত্ব হ্রাস করছে তা নয়, একই সাথে প্রবাসীদের প্রেরণকৃত রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আয় করে এমন শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্সের অবদান জিডিপি’র প্রায় ১২ শতাংশের সমান। ২০১৫ সালে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্সের পরিমাণ প্রায় ১৫.২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ক্রমান্বয়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে (বর্তমানে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা আমাদের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা নয়, গুণ ও মানের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদেশ গমনেচ্ছুক কর্মীর সার্বিক নিরাপত্তা ও যৌক্তিক অভিবাসন ব্যয় নিয়ে বর্তমান সময়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। এ সকল বিষয় বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী কর্মীদের কল্যাণ নিশ্চিতকরণে আইন ও বিধি তৈরি থেকে শুরু করে এর প্রয়োগসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

অভিবাসন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সারা বিশ্ব একটি পরিবারে পরিণত হয়, বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভেদাভেদ কমিয়ে আনে। বিশ্বে এক প্রান্তের মানুষ জীবিকার খোঁজে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছে। নিজের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বিনিময় করছে। নিজ ও পরিবারের জীবনমানের উন্নতি এবং একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এ দেশের মানুষ ১৯৭৬ সাল থেকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গমন করছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে তারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশাল অবদান রাখছে এবং দেশকে সমৃদ্ধ করছে।

এ যাবৎ বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৬১টি দেশে ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি কর্মী নানা পেশায় কর্মসংস্থান হয়েছে এবং এ সংখ্যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশি কর্মীরা বিদেশে যথেষ্ট সুনাম ও দক্ষতার সাথে কাজ করে। পূর্বের তুলনায় এখন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী বেশি গমন করছে। সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে, পুরুষের পাশাপাশি মহিলা অভিবাসী কর্মীরাও এগিয়ে আসছে। বর্তমানে প্রতি বছর মোট প্রবাসী কর্মীর প্রায় এক চতুর্থাংশ নারী কর্মী যাচ্ছে। এ সকল কর্মী শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশে প্রেরণ করে যাচ্ছে, সামগ্রিক অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে বড়ো ভূমিকা পালন করছে।

বিশ্ব শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীর চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে এখন পূর্বের যে-কোনো সময়ের তুলনায় অধিক হারে দক্ষ কর্মী বিদেশে যাচ্ছে। অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ কর্মীদের তুলনায় দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত কর্মী অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করে বলে বর্তমানে ৭১টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ৪৮টি ট্রেডে দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় দেশের প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৪০টি উপজেলায় ৪০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।

২০০৮ সালে শুরু হওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় অনেক উন্নত অর্থনীতি প্রচ- হোঁচট খেলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা তেমন কোনো দৃশ্যমান প্রভাব ফেলেনি। তার প্রধান কারণ প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত অর্থ। বাংলাদেশ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্জনকারী দেশ। আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্জনে সবচেয়ে বেশি অবদান রেমিটেন্স খাতের। এটি সম্ভব হয়েছে নিরাপদ ও নিশ্চিত অভিবাসনের জন্য। নিরাপদ ও কম অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী প্রেরণ করতে সরকার ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। দেশ ভেদে কর্মী প্রেরণে ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে কঠোরভাবে তা মনিটরিং করা হচ্ছে। ২০১৬ সালের আগষ্ট মাস থেকে সৌদি আরব সব সেক্টরে কর্মী নেওয়ার ঘোষণার পর বাংলাদেশ সরকার সে দেশে কর্মী প্রেরণের অভিবাসন ব্যয় ১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেয়। তাছাড়া জিটুজি প্লাস প্রক্রিয়ায় মাত্র ৪০ হাজার টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে সরকার মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

বর্তমান সরকার বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের অধিকার ও কল্যাণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। স্মার্ট কার্ড ও বর্হিগমন ছাড়পত্র প্রদান কার্যক্রমকে বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ঢাকা জেলার পাশাপাশি জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও কুমিল্লা থেকে স্মার্ট ও বহির্গমণ ছাড়পত্র প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও এসব কার্যালয়ে প্রবাসী কর্মীর পরিবার ও স্বজনদের প্রবাসী কর্মীর নিকট গমণপূর্বক স্বল্প সময়ে অবস্থানের জন্য জয়েনিং রিলেটিভ (ঔড়রহরহম জবষধঃরাব) হিসেবে অনাপত্তিপত্র (ঘড় ঙনলবপঃরড়হ ঈবৎঃরভরপধঃব) দেওয়া হয়ে থাকে।


-২-

বিদেশে কর্মরত কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মর্যাদা ও অধিকার সুরক্ষার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতিসংঘ ২০০০ সাল থেকে ১৮ ডিসেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেই থেকে এই দিনটিকে যথাযথ মর্যাদায় পালন করে আসছে বিশ্বের সবাই। বিশেষ করে অভিবাসী কর্মী প্রেরণকারী ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ এই দিবসকে যথাযথ মর্যাদা ও গুরুত্বসহকারে পালন করে থাকে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম অভিবাসী কর্মী প্রেরণকারী দেশ। বাংলাদেশেও এ দিবসটি পালন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স জাতীয় উন্নয়নের অগ্রগতিকে আরো ত্বরান্বিত করছে। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এবং নিজস্ব আয় থেকে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রবাসী কর্মীদের প্রেরিত রেমিটেন্স গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের মূলে রয়েছে প্রবাসী কর্মীদের কষ্টে অর্জিত অর্থ। প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের ত্যাগের বিনিময় আমরা তৈরি করছি উন্নয়নের মহাসড়ক। বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি করছে, যা সম্ভব হয়েছে প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স এবং ক্রমান্বয়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সঞ্চিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধির কারণে। তাই এ বছর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য- “উন্নয়নের মহাসড়কে অভিবাসীরা সবার আগে” বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ যথার্থ-এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

share this news to friends