লেবাননে প্রবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রদূতের মতবিনিময়

লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ত্রিপোলি। আরবি ভাষায় ত্রিপোলিকে বলা হয় ত্রাভুলুস। লেবাননের রাজধানী বৈরুত থেকে সড়ক পথে দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে মাত্র এক ঘণ্টা ৩০ মিনিট। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে ছোট্ট দেশ লেবানন। পুরো দেশটাই সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে। এই ত্রিপোলিতেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজারের মতো। জানা মতে লেবাননে এখন সব মিলে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার বাংলাদেশি বসবাস করছেন।

 

ত্রিপোলি অপরূপ সুন্দর শহর। চারপাশে ভূমধ্যসাগর। কথিত আছে পুরো লেবাননের ঐতিহ্য জানতে হলে অবশ্যই ত্রিপোলিতে যেতে হবে। এখানে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ৩০ অক্টোবর তারিখটা অনেক দিন মনে রাখবেন। কারণ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তারা এখানে বসবাস করছেন। কিন্তু কোনো দিন বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রদূত এখানে আসেননি, খোঁজ নেননি তাদের। এবারই প্রথম রাষ্ট্রদূত আব্দুল মোতালেব সরকার তাদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং নিজে তাদের সুখ দুঃখের কথা শোনার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। দিন প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তাদের কথা শোনেন। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় বিকেল সাড়ে তিনটায় শেষ হয় প্রায় সাতটার দিকে। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি এখানে এসেছিলেন শুধু রাষ্ট্রদূতকে দেখার জন্য।

মতবিনিময় সভায় প্রশ্ন করছেন এক প্রবাসী বাংলাদেশির সন্তান২২ বছর ধরে লেবাননে কাজ করেন জাহাঙ্গীর। কথা হয় সেদিন তাঁর সঙ্গে। তিনি জানান, আজ আমার খুব ভালো লাগছে। কারণ আগে আমরা পাসপোর্ট করতাম ইরান থেকে তারপর জর্ডান থেকে। কোনো সরকারি অফিসার আমাদের সঙ্গে এভাবে খোলামেলা কথা বলেননি কোনো দিন। আমাদের কথা শোনার কেউ ছিল না। কিন্তু আজ আমার খুব ভালো লাগছে এই ভেবে যে, আমরা এখন লেবাননেই পাসপোর্ট বানাতে পারছি। কোনো অসুবিধা হলে আমরা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধান করতে পারছি। এ এক অন্যরকম ভালো লাগা। আমি এখন শক্তি পাচ্ছি। আমাদের দেখার জন্য দূতাবাস আছে আমাদের পাশে। এটা অনেক বড় পাওয়া আমাদের জন্য।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশদুলা মিয়া। তাঁর বাড়ি সিলেটে। ৩০ বছর যাবৎ লেবাননে বসবাস করছেন। বিয়ে করেছেন লেবানিজ মেয়েকে। ভাগ্যক্রমে তিনি প্রথম কোনো বাংলাদেশি যিনি লেবাননের জাতীয়তা পেয়েছেন। পুরোপুরি তিনি এখন লেবানিজ। দুলা মিয়া জানান বর্তমান রাষ্ট্রদূত অনেক ভালো কাজ করছেন। ২০১৩ সালে লেবাননে দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হলেও এখানে কোনো রাষ্ট্রদূত ছিল না। বর্তমান রাষ্ট্রদূত যেভাবে মানুষের কাছে যাচ্ছেন আমরা মনে করি এখন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

মতবিনিময় সভার শুরুতে আব্দুল মোতালেব সরকার সকলের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। তিনি প্রথমে এ সভার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বর্ণনা করেন এবং দূতাবাস প্রবাসীদের জন্য যেসব সেবা দিয়ে থাকে তা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে দূতাবাসের বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয় যাতে তাঁরা সহজে এসব কার্যক্রম মনে রাখতে পারেন।

উল্লেখ্য, লেবাননে নিযুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রদূত বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তার মধ্যে রয়েছে প্রতি মাসে অন্তত দুবার দূর দূরান্তে যেখানে বাংলাদেশিরা আছেন তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা। দূতাবাসের কর্মীরাই যাবেন প্রবাসীদের কাছে। তারা কথা শুনবেন প্রবাসীদের কাছ থেকে। মতবিনিময় সভার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধান করা যায় বলে মনে করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, অফিস দূরে থাকার কারণে অনেকে কাজের জন্য দূতাবাসে আসতে পারেন না। কী কী সেবা দূতাবাস থেকে পাওয়া যায় সেটাও জানেন না অনেকে। তাই প্রবাসীদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শোনার জন্য আমরা প্রবাসীদের কাছে যাব। তাদের কথা শুনব এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আমরা সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছি যেন প্রবাসীদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা যায়। তিনি বলেন, যদিও আমাদের জনবল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম তবুও আমরা আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছি এবং এ প্রচেষ্টা আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, লেবাননে প্রবাসীদের জন্য অন্যতম সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশি দালালেরা। তারা সাধারণ কর্মীদের ভুল তথ্য দিয়ে একদিকে যেমন তাদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করছে অন্যদিকে তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। তিনি দালালদের উদ্দেশ্যে বলেন, এরা সবাই বাংলাদেশি। আপনাদেরই কারও ভাই-বোন বা আত্মীয়স্বজন। তাই তাদের প্রতি সদয় হওয়ার এবং তাদের প্রতারণা না করার জন্য তিনি এসব দালালদের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশসভা শেষে তিনি অনেকের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শোনেন এবং এসব সমস্যা সমাধানে দূতাবাস কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদানের কথাও জানান। দূতাবাসের ডাকে সাড়া দিয়ে কষ্ট করে দূর-দূরান্ত থেকে সভায় উপস্থিত হওয়ার জন্য সকলকে তিনি ধন্যবাদ জানান।

প্রবাসী কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা চলাকালে কথা হয় আরেকজন প্রবাসী বাংলাদেশি আজাদ মিয়ার সঙ্গে। তিনিও বিয়ে করেছেন লেবাননের নারীকে। চার মেয়ের বাবা। তিনিও লেবানন আছেন প্রায় ২৮ বছর যাবৎ। দূতাবাসের এই কার্যক্রমকে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক দিন পর আমরা দূতাবাস পেয়েছি এবং দূতাবাস যে সেবাগুলো দিচ্ছে তাতে আমি খুশি। কারণ এখানে অনেক কষ্টে দিনযাপন করছেন বাংলাদেশিরা। এমন সেবা যদি দূতাবাস অব্যাহত রাখে তাহলে প্রবাসীদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

share this news to friends