করোনা ও  ‘ঘুমন্তপুরী’ নিউইয়র্ক

২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে যে প্রাণবন্ত নিউইয়র্ক শহরে আমার সংসার জীবন শুরু করেছিলাম সেই শহরটির যে এমন রুপ দেখব তা কখনও স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার স্বপ্নের শহর নিউইয়র্ক এখন নীরব এবং নিস্তব্ধ, এ যেন এক অচেনা শহর। পুরো বিশ্বের কাছে এই শহরটি ‘ঘুমহীন নিদ্রাহীন সদা জাগ্রত’ বলে পরিচিত। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে আমাদের অতি প্রিয় এই শহরটি এখন যেন একটা ‘ঘুমন্তপুরী’ ।  


নভেল করোনা (কভিড-১৯) মহামারীর এই কঠিন সময়ে পরম করুণাময়ের অসীম কৃপায় আমার নিজের পরিবার ও নিকট আত্মীয়রা সবাই এখন পর্যন্ত সুস্থ আছে। তবে প্রতিদিনই অ্যাম্বুলেন্সের সাঁইরেনের শব্দে আমাদের সকাল হয়। পরিচিতদের মৃত্যুর সংবাদে হৃদয় ভারাক্রান্ত  হয়। 


নিউইয়র্কের এখন এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে যে তা বোঝানোর জন্য নিউইয়র্ক শহরের একটি শোকাবহ ঘটনা তুলে ধরছি। ভাগ্যরথের চাকা ঘোরাতে বেশকিছু দিন আগে স্বামী-সন্তানসহ এক নারী এসেছিলেন এই স্বপ্নের শহর নিউইয়র্কে। ভালোই চলছিল তাদের। তিনি নিজে কাজ করতেন, তার স্বামীও কাজ করতেন। সন্তানরা স্কুলে যায়। করোনার বিপদ সংকেত পাবার সাথে সাথেই স্বামী ছুটি নিয়ে বাড়িতে বসে রইলেন, সন্তানরাও বাড়িতে। কিন্তু ভদ্রমহিলা নিজেই কাজের জায়গা থেকে করোনা ভাইরাস বাড়িতে নিয়ে আসলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাদের সন্তানরাও আক্রান্ত হলো এই ভাইরাসে। হাসপাতালে জায়গা না পাওয়ায় বাড়িতেই চিকিৎসা চলছিল তাদের। একদিন খুব ভোরে ভদ্রমহিলা স্বামীর ঘরে ঢুকে দেখলেন তার স্বামী মারা গেছে। বাইরে থেকে রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে সন্তানদের ডেকে ওঠালেন এবং জানালেন সবকিছু। নিজেই ‘৯১১’ কল করে জানতে পারলেন যে তাদের আসতে দেরি হবে। 


দেরি হবার যথেষ্ট কারণও তো রয়েছে। নিউইয়র্ক শহরের পুলিশ অফিসার, ফায়ার ব্রিগেড, নার্স, সোশ্যাল ওয়ার্কারসহ মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত। বাকিরা মৃত্যুর শহরে দিনরাত ব্যস্ত রোগী আর মৃতদেহ নিয়ে। সারাদিন ওই পরিবারের অসুস্থ মানুষগুলো বসে রইলেন তাদের অতি প্রিয়জনের মৃতদেহ নিয়ে। বিকেলে সোশ্যাল ওয়ার্কাররা আসলো, কিন্তু সাথে আসলো না মর্গের গাড়ি কিংবা কোন সরঞ্জাম। কিছু মৃতদেহ মাটিচাপার পর মর্গ কিছুটা খালি হলে তারা নিয়ে যাবে মৃতদেহ। প্লাস্টিকের ডাবল বডি ব্যাগে স্বামীর দেহ ভরে, স্প্রে করে রুমেই রেখে বন্ধ দরজায় ‘প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে সোশ্যাল ওয়ার্কাররা চলে গেলেন। 


এক বাসায় প্রিয় স্বামীর মৃতদেহ অন্য ঘরে আর অন্য ঘরে একই রোগে আক্রান্ত পরিবারের অন্য সদস্যরা ঠাঁয় বসে রইলেন। ভদ্রমহিলা স্বামীহারা হলেন। এখন তার মনে প্রশ্ন, করোনার সাথে যুদ্ধ করে সন্তানদের কি আগলে রাখতে পারবেন নিজের কোলে? এমন আরও স্বজন হারানোর খবর শুনছি প্রতিনিয়ত। এক ক্যান্সার আক্রান্ত নারী হারিয়েছেন তার স্বামীকে। দশ মাসের বাচ্চা হারিয়েছে মাকে, মাতৃহীন তিন সন্তানের পিতাকে কেড়ে নিয়েছে করোনা, তিন সন্তানের জননী, আমার প্রতিবেশী চলে গেলন না ফেরার দেশে। করোনা আক্রান্ত স্ত্রী হারালেন একই রোগে আক্রান্ত স্বামীকে। সন্তানদের সুস্থ রাখতে দুরে সরিয়ে রাখতে হচ্ছে অসহায় মাকে। 


শুধু নিউইয়র্ক না, এই মহামারী বিরাজ করছে পৃথিবীর কোণায় কোণায়, প্রত্যেকটি দেশে। সারাবিশ্বের মধ্যে আমেরিকায় এখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, এর মধ্যে আবার নিউইয়র্ক রয়েছে শীর্ষে। আজ সারা নিউইয়র্ক জুড়ে আতঙ্ক। 


আমি নিউইয়র্কের কুইন্সের বাসিন্দা। কুইন্স আমেরিকার অন্যতম জনবহুল কাউন্টিগুলোর একটি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের বাস এখানে। তাঁদের কথিত ভাষার সংখ্যাও অনেক। যারা এখানে বাস করেন তাঁদের বেশিরভাগই অভিবাসী। অভিবাসী অধ্যুষিত এই কাউন্টিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা অন্য সবগুলোর চেয়ে বেশি। অর্থ-বিত্তে, প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ অতি প্রভাবশালী এই নিউইয়র্ক শহরের হাসপাতালগুলোর বর্তমান অবস্থা নাজুক। পর্যাপ্ত পরিমাণে পিপিই নেই, নেই পর্যাপ্ত পরিমানে আক্রান্ত রোগীদের জন্য জীবন রক্ষাকারী ভেন্টিলেটর।


আমাদের গভর্নর, মেয়র চেষ্টার ত্রুটি করছেন না অভিবাসী অধ্যুষিত বৃহৎ এ নগরীর জন্য। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সারা দেশে ইমার্জেন্সী দিয়েছেন, দিচ্ছেন আর্থিক সহয়তাও। শহরের সেন্ট্রাল পার্ক, মাউন্টসিনাই হসপিটাল সেন্টারের কাছে অস্থায়ী হাসপাতাল গড়ে তোলা হচ্ছে। আমেরিকান নৌবাহিনীর ভাসমান হাসপাতাল নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে নোঙর করেছে সাদা রঙের বিশাল আকারের এই জাহাজটি। এক হাজার মানুষকে চিকিৎসা দিতে সক্ষম এই ভাসমান হাসপাতালটিতে চিকিৎসা হবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নয় এমন রোগীর। 


লকডাউনের এই সময়ে আমরা নিজেকে ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছি। সবাই সাবধানে থাকুন। যেভাবেই হোক সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখুন। এইটাই একমাত্র কার্যকরী  মহৌষধ এই মরনব্যাধির জন্য। এত সতর্কতা নেওয়ার পরেও নিউইয়র্কের অবস্থা এই হলে, বাংলাদেশের কী হবে তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। করোনা ভাইরাসের কারণে মানুষের জীবনে যে অন্ধকার নেমে এসেছে তা থেকে আমরা কবে আলোর মুখ দেখব জানি না। তবে আশার কথা হলো, নিউইয়র্কে ক্রমান্বয়ে কমছে আক্রান্ত এবং মৃতের হার।


মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/এসআর ##

 

share this news to friends