মহামারী পরবর্তী বৈশ্বিক শ্রম অভিবাসন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

করোনা মহামারীতে একদিকে যেমন জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে ফেলেছে বিরূপ প্রভাব। যদিও চীনের উহান শহরে এর উৎপত্তি, কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে তা ছড়াতে ও প্রাণহানি করতে বেশি সময় নেয় নি। আবির্ভাবের মাত্র পাঁচ মাসের ভিতর 'করোনা ভাইরাস' (যা কোভিড ১৯ নামে স্বীকৃত) বিশ্বব্যাপী আক্রান্ত করেছে ১ কোটি ১৫ লক্ষর বেশি মানুষকে আর প্রাণ সংহার করেছে ৫ লক্ষ ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে (সূত্র: WHO, ৮ জুলাই ২০২০)। বাংলাদেশেও এটি রূপ বদলিয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে দিন দিন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জুলাই ৮, ২০২০ এর হিসেবে মতে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১,৬৮,৬৪৫ আর মৃতের সংখ্যা ২,১৫১ জন, যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রায় সব দেশেই 'লকডাউন' বা 'সার্বিক চলাচলে নিষ্ক্রিয়তা' কৌশল এর প্রয়োগ হয়েছে, যার সফলতাও পেয়েছে নিউজিল্যান্ড ও চীনের মতো দেশ। লকডাউনের ফলে সকল ধরণের বাণিজ্য, ব্যবসা, ও যাতায়াত-পরিবহন (বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, ও বর্ডার ক্রস) বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো এবং কোটি কোটি মানুষ কার্যত বেকার হয়ে পড়েছিল। বিশ্ব শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর হিসেবে লকডাউনের কারণে একদিকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে যেমন শ্রম ঘন্টা কমছে প্রায় ৩০%, তেমনি সারা বিশ্বে ২.৫ কোটির ও বেশি কর্মজীবী মানুষের স্থায়ী বেকার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। এর পাশাপাশি, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৬.৪ কোটিরও বেশি শ্রমিক অভিবাসী, যাদের উপর কোরোনার প্রভাব সব চেয়ে মন্দ ভাবে পড়ছে।

 

করোনা ভাইরাস মহামারী ব্যাপকতা শুরু করলে, মার্চ ২০২০ হতেই দলে দলে প্রবাসী কর্মীরা বাংলাদেশে ফেরত আসা শুরু করে। কিছু কিছু মধ্যপ্রাচ্যের দেশ যেমন: সৌদিআরব, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত ও দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ তাদের দেশ হতে ১০,০০০ এর বেশি অবৈধ শ্রমিক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সম্প্রতি ব্র্যাক এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, ফেব্রূয়ারি থেকে মার্চ' ২০২০ এর মাঝামাঝি সময়ের ভিতর প্রায় ২,০০,০০০ অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছে, এবং যার সংখ্যা নিয়মিত বিমান চলাচল শুরু হলে বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে, কুয়েত সরকার কর্তৃক 'ফরেন ওয়ার্কার কোটা বিল' অনুমোদনের মাধ্যমে ২৫-৩০ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকদের অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দিচ্ছে, যার ফলে ওই সকল কর্মীর সিংহভাগ খুব শীগ্রই ভারত ও বাংলাদেশে ফেরত আসতে বাধ্য হবেন।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে অভিবাসী বা প্রবাসী কর্মীদের ফেরত আসার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ যেহেতু খনিজ তেল উত্তোলন, পরিশোধন ও রপ্তানি নির্ভরশীল, লকডাউনের কারণে তা ব্যহত হওয়ার জন্য তাদের বেশিরভাগই এখন অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে। আবার মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ টুরিস্ট ও সামুদ্রিক পোর্টকেন্দ্রীক বাণিজ্য নির্ভর দেশ হওয়াতে, লক ডাউন ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্যও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, ফলশ্রুতিতে বেকার হয়ে পড়ছে সিংহভাগ অভিবাসী শ্রমিক। এর ভিতর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ, শোষণ ও দূর্দশার শিকার হচ্ছে আনডকুমেন্টেড বা অবৈধ অভিবাসীরা (যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ, বা ওয়ার্ক পার্মিট নেই এবং বেকার), তারা না পাচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, না পাচ্ছে কোনো অর্থনৈতিক সহায়তা। উপরন্তু ওয়ার্কার ক্যাম্পে স্বল্প জায়গায় একসাথে গাদাগাদি করে ওই সব অভিবাসী শ্রমিকদের থাকতে হচ্ছে, যা করোনা সংক্রমণের আশংকা আরো বাড়িয়ে দেয়।

 

যদিও বাংলাদেশ সরকার করোনা আবির্ভাবের শুরু থেকে দূতাবাসগুলো মাধ্যমে অভিবাসী শ্রমিকদের মাঝে ত্রাণ ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করে আসছে, কিন্তু তা সাময়িক সহায়তা দিলেও তাদের চাকুরী নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও বসবাসের নিশ্চয়তা ছিল না। এদের ভিতর অনেকেই আছে যারা সম্প্রতি গিয়েছেন এবং যাদের অভিবাসন ব্যয়ের অর্থ এখন অব্দি উঠে আসে নাই। আবার অনেক পরিবার আছে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যার ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের পাশাপাশি তাদের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও সমপরিমাণ  ঝুঁকিতে রয়েছে। বিএমইটির তথ্য মতে, বর্তমানে দেশের বাইরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে, যাদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের উপর নির্ভরশীল প্রায় ৩-৪ কোটি মানুষ।

 

আইএলও ও বিশ্ব ব্যাংকের পর্যালোচনার ভিত্তিতে যদিও ধারণা করা হচ্ছে করোনা ভাইরাস উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী রেমিট্যান্সের প্রবাহ আশংকাজনক ভাবে কমে যাবে এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে প্রায় ২৫%। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ২০১৯-২০ অর্থ বছরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, এই বছর রেকর্ড পরিমান ১৮.৩২ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে, যার সিংহভাগ এসেছে করোনাকালীন এবং ঈদ এর সময়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রবাসী শ্রমিক দেশে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে তাদের জমানো অর্থ, মজুরি, প্রবাসে বিনিয়োগের অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন,- যার ফলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এক কথায় শ্রম অভিবাসনের জন্য এক অশনি সংকেত। কারণ, সম্ভাব্য বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারে, ফলে ভিন্ন একধরণের জটিল পরিস্থিতি (অর্থনৈতিক ও সামাজিক) তৈরির আশংকা থাকে, যা সামলানোর প্রস্তুতি আমাদের নেই।

 

প্রত্যাবর্তিত অভিবাসী শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার যদিও সচেষ্ট এবং বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগও গ্রহন করেছে, যার ভিতর রয়েছে: বিশেষ বিমানে দেশে ফেতর আনয়ন, ১৪ দিনের আইসোলেশন শেষে নিজ বাড়িতে ফেরার জন্য এয়ারপোর্ট হতে নগত অর্থ সহায়তা, বৈধ-অবৈধ সকল অভিবাসী কোভিডে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে ৩ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা প্রদান, এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রত্যাবর্তিত অভিবাসী কর্মীদের মাঝে ১-৫ লক্ষ টাকার সফ্ট লোন প্রদান ইত্যাদি। সম্প্রতি সরকার দুঃস্থ ও দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে সামাজিক রেশনের ব্যবস্থাও চালু করেছে যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

 

যদিও সরকার ফেরত কর্মীদের ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে, তারপরেও শংকা থাকে অনেকের বেকার থাকার, যার কারণে হতে পারে সামাজিক শান্তি বিনষ্ট, বাড়তে পারে অপরাধ এবং অনেকে অবৈধ ভাবে আবার অভিবাসনের চেষ্টা করতে পারে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে, সার্বিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে আমাদের বিদেশ ফেরত অভিবাসী কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে একযোগে কাজ করতে হবে। যদিও আশংকা থাকে করোনা পরবর্তী শ্রম অভিবাসন ও দেশভিত্তিক ইমিগ্র্যাশন ব্যবস্থাপনায়, যার কারণ সহজে অনুমেয়। নিজে দেশের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়, নিজস্ব অর্থনীতির চলমান বেগ পুনরুদ্ধার, নিজ দেশের জনসাধারণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য অনেক দেশই অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে, যা স্বাভাবিক ভাবেই শ্রম অভিবাসনকে কঠিন করে তুলবে।

 

বাংলাদেশের মতন উন্নয়নশীল দেশের জন্য রেমিট্যান্সের অবদান ব্যাপক, বিশেষ করে দেশের 'ব্যালান্স অফ পেমেন্ট', ও অভন্তরীন বাণিজ্যে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। যদিও আমাদের 'প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ২০১৬', 'বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন ২০১৩', এবং 'ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ আইন ২০১৮' ইত্যাদি আইন ও নীতি রয়েছে নিয়মিত অভিবাসনকে গতিশীল করা, অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় করা এবং অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, কিন্তু এই বৈশ্বিক মহামারী উত্তর শ্রম অভিবাসন নিয়মিতকরণের কৌশল প্রণয়নে আমরা এখনো যথেষ্ট সচেতন নই।

 

করোনা মহামারী উত্তর পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় স্বাস্থ্যখাতে ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। পাশাপাশি, অন্যান্য দৈনন্দিন জীবন যাপনে, খাদ্যাভ্যাসে, ও চলাচলে পরিবর্তন আসবে, যা আমাদের মানিয়ে নিয়েই চলতে হবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে দক্ষ ও টেকনিক্যালি পারদর্শী মানবসম্প্রদায়ের। তাই আমাদের জোর দিতে হবে বৈশ্বিক চাহিদা অনুসারে দক্ষ কর্মী তৈরিতে। সে জন্য আমরা অভিজ্ঞ বিদেশ ফেরত কর্মীদের সমন্বয়ে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে এবং তৈরী করতে হবে ডাটাবেসের। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কারিগরি দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রকল্প যেমন: SEIP, সুদক্ষ, বি-সেপ (B-SEP), B-skillFUL ইত্যাদির আসন সংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এছাড়া সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে আবাসন ব্যবস্থাসহ, সার্বিক মান উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে।

 

অভিবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্যাকেজ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রণোদনার পাশাপাশি অভিবাসী শ্রমিকদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে অনুকূল পরিবেশ ও বিশেষ সেবার ব্যবস্থা করতে হবে। রেমিট্যান্স এর প্রবাহ বৈধ পন্থায় নিশ্চিত করতে আর্থিক প্রণোদনার (বর্তমানে সরকার ২% অতিরিক্ত প্রণোদনা দিচ্ছে অনুমোদিত চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনয়নে) পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেন সার্বজনীন (যেমন: পোস্ট অফিসের মাধ্যমে, মোবাইল মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে, এটিএম বুথের মাধ্যমে) করতে হবে।

 

করোনা পরবর্তীকালীন প্রতিযোগিতামূলক শ্রম বাজারে অভিবাসনকে নিয়মিত, বহুমাত্রিক, সার্বজনীন ও নিরাপদ করতে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী দূতাবাস ও বেসরকারি সংস্থাকে সমন্বয় করে ও দেশের ভাবমূর্তি সমুন্নত রেখে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কর্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাজ করতে হবে। নতুবা আমাদের কয়েক যুগের কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে প্রাপ্ত শ্রমবাজার অন্য কোনো দেশ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে পারে, যা আমাদের কাম্য নয়।

আমিনুল হক তুষার (অভিবাসন বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী)

share this news to friends