সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানবপাচার কমিয়ে আনা সম্ভব : নাসিমা বেগম

মানবপাচারকে মানবাধিকরের চরম লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম এনডিসি বলেছেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই পানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।

৩০ ‍জুলাই আন্তর্জাতিক মানব পাচার বিরোধী দিবস ২০২০ উপলক্ষে  আজ বুধবার অনলাইনে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নাসিমা বেগম এ কথা বলেন।

সুইস এজেন্সী ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যন্ড কোঅপারেশন (এসডিসি) এর সহযোগিতায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এবং উইনরক ইন্টারন্যাশনালের আশ্বাস প্রকল্প যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাতীয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাসিমা বেগম বলেন, মানবপাচার একটি জঘন্যতম অপরাধ। এই অপরাধ নির্মূলের বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সরকারের স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সরকারি বেসরকারি সংস্থার কার্যকরী উদ্যোগই পারে মানবপাচার কমিয়ে আনতে।

বিদেশ গমনেচ্ছুদের প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, যারা বিদেশ যেতে চায় তদের প্রশিক্ষণটা খুব জরুরি। কারণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষ সহজে পাচারের শিকারের হয় না। যে জানে কোনটা তার জন্য ভালো কোনটা মন্দ। যারা পাচারের শিকার হয়ে উদ্ধার হন তাদের মানাসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, যারা পাচারের শিকার হন তারা বিভিন্ন নির্যাতনের ফলে মানসিকভাবে ট্রামাটাইজড হয়ে যান। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নজর দিতে হবে।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ও মানবপাচার বিষয়ক জাতীয় কমিটির দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু বকর সিদ্দিক বলেন, গায়ে মলম দিয়ে আসলে ভেতরের রোগ সারানো যাবে না। নজর দিতে হবে মূল সমস্যার দিকে। কারণ আমি মনে করি মানবপাচারের সবচেয়ে বড় কারণ দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই পাচারকারীদের কবলে পড়তেন না। তিনি বলেন, মানবপাচার রোধে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ দরকার যাতে দেশের অভ্যন্তরে পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হয়।

অনুষ্ঠানের আরেক অতিথি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব মোজাফফর আহমেদ বলেন, ট্রাভেল অ্যাজেন্সিগুলোর মাধ্যমেই মূলত মানব পাচার বেশি হয়ে থাকে। পাচারের শিকার তারাই হয় যাদের জানাশোনা কম এবং অদক্ষ। দক্ষরা পাচারের শিকার হন না। এ জন্য আমাদের মন্ত্রণালয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছে। প্রচারণা ও পাচারের অভিযোগে আমরা বিভিন্ন এজেন্সীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। ঢাকার আদালতে ১১টি ফৌজদারি মামলা রুজ্জ করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অনেক এজেন্সীকে জেল জরিমানাও করা হয়েছে। আমাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে ইনসিডিন-এর পরিচালক একেএম মাসুদ আলী টিআইপির সুপারিশ ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন।

জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার কান্ট্রি ডিরেক্টর তরিকুল ইসলাম বলেন, মানবপাচার সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর যথাযথ মনিটরিং দরকার। যথাযথ মনিটরিং হলে এখান থেকে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, প্রতিবছরই মামলার সংখ্যা বাড়ছে। প্রায় ছয় হাজার মামলা হলেও বিচার হচ্ছে না। ২০১৯ সালেও ৬২৫ টি মামলা হয়েছে কিন্তু মাত্র ৩৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আর কোভিড আমাদের সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ অনেক লোক বিদেশে যেতে পারছে না। অনেকে ফেরত এসেছেন। গত তিন বছরের সরকারি বেসরকারি সবার প্রচেষ্টার ফলে মানবপাচারে টায়ার ২ ওয়াচ লিস্ট থেকে আমাদের উন্নতি হয়েছে। সেটা আমাদের ধরে রাখতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে এনজিও ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, মানবপাচার প্রায় ১৫০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য। প্রাচীনকালেও ছিলো, এখনও আছে। তবে ধরন বদলেছে। আপনাদের সবার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে আমিও মনে করি, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই ও অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।

উইনরক ইন্টারন্যাশনাল এর আশ্বাস প্রকল্পের টিম লিডার দীপ্ত রক্ষিত অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। আরও বক্তব্য রাখেন  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইশরাত শামীম, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের শিক্ষক কামাল চৌধুরী, সুইস এজেন্সী ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কোঅপারেশন (এসডিসি) এর ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার নাদিম রহমন প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মানব পাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সরকারি বেসকরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

share this news to friends