প্রবাসী নারীকর্মীদের সুখ-দুঃখের গল্প

বহুকাল আগে থেকেই অধিক উপার্জন আর উন্নত জীবন জীবিকার আশায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও প্রবাসের বিভিন্ন কর্মে নিজেদের নিয়োজিত করে শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর শ্রম অভিবাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিপুল জনগোষ্ঠীর এইদেশের শ্রমবাজারে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখেরও বেশি নারী ও পুরুষ কর্মী যুক্ত হচ্ছে। তার তুলনায় কর্মসংস্থানের হার একেবারে কম। তাই এর বিরাট একটি অংশ প্রতিবছর কর্মহীন হয়ে পড়ে। কর্মহীন থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সমাজে নানারকম সমস্যার সূত্রপাত হয়। তখন আমাদেরকে একরকম বাধ্য হয়েই ভাবতে হয় শ্রম অভিবাসনের কথা। 

যদিও স্বাধীনতার পরপরই আমাদের দেশের নারীরা দেশের অভ্যন্তরে নানা কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে পারিবারিক স্বচ্ছলতা ও দেশের অর্থনীতিতে নিরন্তর অবদান রাখা শুরু করেছে। এর যাত্রা অনেক আগেই বাংলাদেশের নারী কর্মীদের শ্রম অভিবাসন শুরু হয়েছিল তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশের নারীরা সরাসরি শ্রম অভিবাসনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশে নারীকর্মী প্রেরণ শুরু করে। বাংলাদেশের নারীকর্মীদের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। আবার কখনো বন্ধ হয়ে ফের চালু হয়েছে। নারীকর্মী প্রেরণের এই উত্থানপতনের ধারায় বাংলাদেশ ২০-২৫ টি দেশে মোট ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৯৫ জন নারীকর্মীকে বিদেশে চাকুরির জন্য পাঠিয়েছে। আমরা তাদের শ্রম-ঘামের রেমিট্যান্সও পেয়েছি প্রচুর। তাদের রেমিট্যান্সই আমাদের বিকাশমান অর্থনীতিকে দেখিয়েছে নতুন গতিপথ। আমরা কতটুকু ভাবছি তাদের কথা। রেমিট্যান্সের ডলার বা টাকার গায়ে যেমন একাধিক রঙ বিদ্যমান। তেমনি বিশাল রেমিট্যান্স পাহাড়ের গহীনকোণে প্রবাসী নারীকর্মীদের রেমিট্যান্স অর্জনের স্মৃতিতে আছে দুটো রং- একটি সুখের, আরেকটি দুঃখের। কিছু স্মৃতি সুখময় আবার কিছু স্মৃতি রীতিমত ভয়ঙ্কর। সাম্প্রতিককালে মধ্যপাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ফেরত এসে দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা তুলে ধরছেন। গণমাধ্যমের সুবাদে তা আমাদেরকেও রীতিমতো বিচলিত করে তুলেছে।

বাংলাদেশের নারীকর্মীদের শ্রম অভিবাসনের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রথমদিককার ইতিহাস অতটা সুখকর ছিলনা। তখন যেসব নারীকর্মী বিদেশে যেতেন তাদের অধিকাংশই ছিলেন অদক্ষ। তাদের অনেকেই দেশের অভ্যন্তরে কোন নিয়মিত চাকরি বা কর্মে নিযুক্ত ছিলেননা। তাদের অনেকে সমাজ সংসারের নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে পরিবারের হাল ধরার আশায় বাধ্য হয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিদেশ-বিভুঁইয়ে। তাদের কেউ কেউ দেশে মাটিতে সহায় সম্বলহীন হয়ে, কেউ স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে, পরিবারের সদস্যদের উপেক্ষার পাত্র হয়ে, প্রতারক প্রেমিকের প্রেম বঞ্চনার শিকার হয়ে, পাড়া মহল্লায় উঠতি মাস্তান আর বখাটে যুবকের উৎপাতে, দেশের অভ্যন্তরে কর্মক্ষেত্রে নানা লোকের কুপ্রস্তাব হতে রক্ষা পাওয়ার আশার হাতছানি দেখেছিল সুদূর মধ্যপ্রাচ্যে। শ্রম অভিবাসী নারীকর্মীর এই মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন বাগেরহাটের চার সক্ষম সন্তানের এক জননী। এই মিছিলে আজো শরিক হচ্ছে দেশের হাজার হাজার কিশোরী-তরুণী-যুবতী-মহিলা। 

এদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশের মাটিতে নানা ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে কর্মস্থলে হাসিমুখে কাজ করে গেছেন। আর হাসি ফুটিয়েছেন দেশে রেখে যাওয়া অসহায় পরিবারের মুখে। বীরত্বের সাথে নিজ কর্মস্থলে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। প্রশংসাও পেয়েছেন প্রচুর। আপন করে নিয়েছেন বিদেশকে, আপন হয়েছেন বিদেশের মানুষের। অর্জিত অর্থে দেশে গড়েছেন স্বপ্নের সিঁড়ি। সেই সিড়ি বেয়ে ধাঁধাঁ করে এগিয়ে গেছে দেশের অর্থনীতি। প্রতিবেশীর কাছে হয়েছেন অনুকরণীয় উদাহরণ। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ বিরতিহীন ভাবে দীর্ঘ সময়ধরে কাজ করানো,সঠিক বেতনাদি সময়মত পরিশোধ না করা, দীর্ঘ সময় খেতে না দেওয়া, অবসর-বিনোদন-ছুটির ব্যবস্থা না করা, নিরাপত্তাহীনতা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি কারনে ব্যর্থতার ডালি মাথায় বিফল হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। কেউ সমাজ বা পরিবার কর্তৃক ধিকৃত হয়ে বহিস্কৃত হয়েছেন। কেউ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাই নিয়েছেন। কেউ কেউ হাসপাতালে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকেই তাদেরকে অচ্ছুৎ, দায় বা বোঝা জ্ঞান করছেন। 

প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দেশ থেকে প্রত্যাগত হয়ে নারীকর্মীরা বাংলাদেশে আসছেন। শোনা যাচ্ছে নানা বিষাদময় সব গল্প। তখন দেশের অনেক মহল থেকেই নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর ব্যাপারে নানা উদ্বিগ্ন মতামত আসছে। কেউ কেউ আবার বিদেশে নারীকর্মী পাঠাতে সরাসরি নিষেধ করছেন। তবে অভিবাসন একটি স্বাভাবিক এবং প্রায় স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। কাজের খোঁজে মানুষ স্ব-উদ্যোগেই বিদেশে যায়। এই স্বাভাবিক অবস্থা অস্বাভাবিক করে তুললে পরিনামে চরম মুল্য পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশের নারী সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তি ও টেকসই সামাজিক অবস্থান সৃষ্টি করতে নারীকর্মীর শ্রম অভিবাসন অত্যন্ত জরুরি। লক্ষণীয় যে, বিগত সময়ে নারী কর্মীর অভিবাসন বিভিন্ন কারনে ব্যাহত হওয়ার কারনে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে যৌনব্যবসার উদ্দেশ্যে পার্শ্ববর্তী দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ভাবে নারীপাচারের ঘটনা ঘটতো। তাই বলা হয় অভিবাসন ও মানবপাচার একে অপরের সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। অভিবাসন ব্যাহত হলে মানব পাচার বেড়ে যাবে - এটাই স্বাভাবিক।

নিঃসন্দেহে সৌদি আরব বাংলাদেশের বড় একটি শ্রমবাজার এবং ভাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ। ধর্মের খাতিরে আমরা আরো কাছাকাছি ভাবি। আমাদের শ্রমিকেরাও সেখানে যেতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। যেদেশে প্রেমের শাস্তি শিরñেদ, চুরির শাস্তি হাত কেটে ফেলা সেদেশে ভিন দেশের গৃহকর্মীর উপর পাশবিক নির্যাতন কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। যদিও সবাই জড়িত নয়, তারপরও যেকোন বিরূপ ঘটনার তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা আরোও জোরদার করা উচিত। আমরা সৌদি আরবকে আমাদের হৃদয়ে যে শ্রদ্ধার অবস্থানে রেখেছি নিশ্চয় সৌদি আরব সে সম্মান সম্পর্কে সচেতন আচরণ করবে। এতে দু’ দেশই লাভবান হবে।

নারীকর্মীর নিরাপদ, নিয়মিত, সুশৃঙ্খল ও দায়িত্বশীল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশেই বিদেশ গমনেচ্ছু নারীকর্মীদের সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে বিএমইটি-তে নারী অভিবাসী কেন্দ্র স্থাপন করেছে, দেশের প্রায় সব জেলা/উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে যথাযথ ভাষা ও ট্রেড প্রশিক্ষণ প্রদান করে নারীকর্মীদের যোগ্য করে তুলছে, নারীকর্মীর অধিকার রক্ষায় দেশেবিদেশে আলাপ আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। বিদেশে নির্যাতনের শিকার নারীকর্মীদের জন্য সেফহোম, শেল্টার হাউজ, দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা, দূতাবাস ও লেবার উইংয়ের মাধ্যমে নারীকর্মীর সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নারীকর্মীর নিরাপত্তা-নিরাপদ কর্মপরিবেশ-বেতন ও ক্ষতিপূরন আদায়ে নিয়োগকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিনিয়ত নেগোসিয়েশন করছে। 

প্রত্যাগত নারীকর্মীরা বিমানবন্দরে আসার সাথে সাথে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে মেডিক্যাল সুবিধাসহ নানা সহায়তা, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে। আর সবার জন্য রয়েছে বিপদের সাথী ২৪ হটলাইন প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার যার নাম্বার (+৮৮ ০১৭৮৪ ৩৩৩ ৩৩৩, +৮৮ ০১৭৯৪ ৩৩৩ ৩৩৩ এবং +৮৮ ০২-৯৩৩৪৮৮৮)। কোনরকম প্রতারণার ঘটনা ঘটলে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তবে সরকার বিদেশ গমনেচ্ছু নারী-পুরুষ সকলকে জেনে-বুঝে, ভাষা শিখে যথাযথ ট্রেনিং নিয়ে শ্রম অভিবাসনে যুক্ত হতে আহবান করছে।

নারীকর্মীরা জেনে-বুঝে, ভাষা শিখে, বেসিক আইনকানুন জেনে, যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে গেলে, দেশীয় প্রশিক্ষনের মান ও মেয়াদ বাড়ালে, তাদের প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন দেওয়া হলে, পাসপোর্ট ও ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে আরো নজরদারি বাড়ালে এবং সকার ও দূতাবাসের মাধ্যমে নারীকর্মীর খোঁজ নিলে, সময়ে সময়ে মালিকের সাথে কর্মীর ব্যাপারে নেওয়া হলে,মাঝে মধ্যে ছুটি-অবসর-বিনোদনের ব্যবস্থা করা হলে, সুষ্ঠু ডেটাবেইজ ও মনিটরিং ব্যাবস্থা জোরদার হলে, নির্যাতন ও প্রতারণাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারলে নারীকর্মীর শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যাই লাঘব হতে পারে।

টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে জাপান প্রবাসী নারীকর্মী নাসরীনের গল্প দিয়েই শেষ করছি। ২০১৭ সালে আইএম জাপানের পৃষ্ঠপোষকতায় পুরান ঢাকার মেয়ে নাসরীন টেকনিক্যাল ইন্টার্ন হিসেবে সম্পূর্ণ বিনা খরচে জাপানে যায়। নাসরীনের ব্যক্তিত্ব, আচার-ব্যবহার, জাপানী ভাষা শিক্ষণের পারদর্শিতা, কর্মস্পৃহা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে যান আইএম জাপানের সিইও কিয়োই ইয়ানাগিসাওয়া। নাসরীনও খুব সহজে জাপানী ভাষা ও সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস ও পরিবেশের সাথে নিজেকে মানানসই করে গড়ে তুলেন। এতে খুশি হয়ে ইয়ানাসান তাকে নাতনী বানিয়ে নেন। গড়ে তোলেন এক পরম আত্মীয়তার সম্পর্ক। এবছর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় নাসরীনের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়ে। সেই অনুষ্ঠানে আইএম জাপানের সিইও মহৎপ্রাণ ইয়ানাসান স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। নাতনীর বিয়ে বলে কথা! বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে নাসরীন আবার চলে গেছেন জাপানে। নাসরীন নিজ যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে শুধু ইয়ানাসান নয়, পুরো জাপানকে জয় করেছে। নাসরীন সফল হয়েছে। নাসরীনই হোক বাংলাদেশের সকল প্রবাসগামী নারীকর্মীর প্রতিচ্ছবি। সব নারীকর্মীর গল্প হোক নাসরীনের গল্পের মতো। সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা দূর করে জয় হোক নাসরীনদের। জয় হোক সকল নারীকর্মীর।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends