কোথাও হারিয়ে খুঁজি, কোথাও খুঁজে হারাই
ছবি : সপরিবার লেখক।- সংগৃহিত

প্রবাসে আমাদের খুব ব্যস্ত জীবন কাটে। জীবনটা চলে ঘড়ির কাঁটার হিসাব ধরে। আর স্বামী-স্ত্রী দু’জন চাকরি করলে তো কোনো কথাই নেই। দু’জনের সাক্ষাৎ হতে যেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে। এ ছাড়া যে যত ধনী বা পয়সাওয়ালা হোক এখানে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কোনো কাজে সহযোগিতা করার মতো কোনো কাজের লোক নেই। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে দেওয়া, বাসার রান্নাবান্না, বাসা গোছানো, বাসার পেছনের বাগানের কাজ, গাড়ি ধোয়া বা বাজার করা - সবই আমাদের নিজেদের করতে হয়। সবকিছু নিয়মমাফিক ও ছকে বাঁধা থাকে।

তাই আমাদের স্ত্রীরা বাংলাদেশে জীবনে কোনো দিন রান্না ঘরে না গেলেও প্রবাসে এসে ওরা বড় রাঁধুনি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে কোনো দিন গাড়ির স্টিয়ারিং না ধরলেও ওরা দূরদূরান্তে নিজে গাড়ি চালিয়ে যায়। বাচ্চাদের বড় করা, বাসার পেছনের বাগানে মালির কাজ, বাসা পরিষ্কার রাখা ও বাজারসদাই - সবই ওরা করে। আর আমরা, বেচারা স্বামীরা তো প্রবাসে পা দিয়েই এসব কাজ করার জন্য নিজেদের পেছনে লেভেল আঁটিয়ে ফেলি। আমরা বড় রাঁধুনি হয়ে উঠি। বাসার পেছনের বাগানে মালির কাজ আমাদের চেয়ে কে ভালো করতে পারে? বাসা পরিষ্কার, গাড়ি পরিষ্কার করা, ধোয়া-মোছা, বাজারসদাই বা বাচ্চাদের ন্যাপি পরিষ্কার না করলে স্ত্রীদের কাছে কী আমাদের রক্ষা আছে?

তবে এরই মধ্যে আমরা ভালোবাসা খুঁজি। ভালোবাসার সংসার গড়ি। আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসে সময় বের করি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাই। কখনো অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করি। আমাদের বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও শোক দিবসগুলো প্রাণভরে পালন করি। বসন্তের উৎসব, শীতের পিঠা উৎসব, ঈদ পুণর্মিলন বা পয়লা বৈশাখের উৎসব পালন করি। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলো তো আছেই।

গত রোববার (১৪ এপ্রিল) গোল্ড কোস্টে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ল্যাবরেডর কমিউনিটি সেন্টারে পয়লা বৈশাখের ভর্তা উৎসব হয়ে গেল। ভর্তা উৎসবটা আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের ছিল এ জন্য যে অনুষ্ঠানে আড়ম্বর ছিল না। অতি সাদামাটা, শুধু ভর্তার উৎসবই হয়েছিল। একটা ঘরোয়া পরিবেশ ছিল। সবাই ঘর থেকে যার যার মতো ভর্তা বানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। কত পদের ভর্তা যে ছিল! সাদা তিল, কালো তিল, সর্ষে ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডিমের ভর্তা, বিভিন্ন শুঁটকি ও মাছ ভর্তা। আলু ভর্তাই ছিল কয়েক পদের। আরও ছিল বিভিন্ন শাকের ভর্তাসহ নাম না-জানা ভর্তা। দীঘল টেবিলে অগণিত ভর্তার সারি দেখে মনে হয়েছিল, সত্যিকারের ভর্তার উৎসব যা হয় তার চেয়েও বেশি কিছু। সঙ্গে সঙ্গে আমার বেশ স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। ভর্তার সঙ্গে সম্পর্কিত স্মৃতি।

আমি ছোটবেলায় মনে করতাম, এসব ভর্তা খায় খুব গরিবেরা। ধনীরা সব সময় খায় পোলাও-মাংস। আর যারা মধ্যবিত্ত, তারা সময়ে পোলাও-মাংস খায়, সময়ে আবার ভর্তাও খায়। কিন্তু দীর্ঘ দু’ যুগ আগে নিউজিল্যান্ডে এসে দেখি, কোনো বাঙালি তাদের বাসায় নিমন্ত্রণ করলে ওরা অতিথিদের জন্য পোলাও-মাংসের পাশাপাশি কয়েক পদের ভর্তাও বানায়। আর অতিথিরাও সেই সব ভর্তা গোগ্রাসে খান। এ নিয়মটা আমি বাংলাদেশে কারও বাসায় আগে দেখে আসিনি। তাই আমি প্রথম প্রথম অবাক হতাম। কিন্তু পরে দেখি শুধু বাসায় নিমন্ত্রণ করেই নয়, বাঙালিদের বড় অনুষ্ঠানগুলোতেও নিয়ম করে পোলাও-মাংসের সঙ্গে বিভিন্ন ভর্তা সাজিয়ে রাখে। আজকাল এই ভর্তা সংস্কৃতিটা পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। বাঙালি খাবার মানেই পোলাও-মাংস বা রোস্টের পাশাপাশি বিভিন্ন পদের ভর্তা থাকবেই।

অথচ এই ভর্তা সংস্কৃতিটা একসময় বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে ছিল। শহরে ছিল না বললেই চলে। আমার নানিকে দেখতাম, খেতের নতুন লাল ধাউন্যা মরিচ ও নতুন রসুন দিয়ে বানানো মরিচের ভর্তা লাল চালের ভাত দিয়ে কীভাবে সয়ে সয়ে খেতেন! আসলে ওটাকে গ্রামের সংস্কৃতি বললে ভুল হবে। গ্রামীণ মানুষের জীবনধারণের একটা অংশও বলতে পারি। কিন্তু গ্রামের সেই সংস্কৃতি বা জীবনধারণের প্রথা গ্রাম থেকে সেই কবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সেই সংস্কৃতি এখন শহরে ভিড়েছে। দেশ ছেড়ে এই দূরদেশে এসেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। 

এবার দেশে গিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুরা মিলে ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের স্টার কাবাবে গিয়েছিলাম। দেশে থাকি না বলে আমার ধারণা ছিল, স্টার কাবাবে শুধু কাবাবই বিক্রি করে। এই ধারণা হওয়ার পেছনে কারণও ছিল। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে দেখেছি, কাবাবের রেস্টুরেন্টগুলোতে শুধু কাবাবই বিক্রি করে। কিন্তু ঢাকার স্টার কাবাবে ঢুকে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। ওরা খাবারের শুরুতে ভর্তা এনে দিল কয়েক পদের।

একসময় পুরান ঢাকায় নীরব ছিল ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার উল্লেখযোগ্য রেস্টুরেন্ট। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে সেই রেস্টুরেন্টে গিয়ে ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার জন্য টেবিল না পেয়ে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একবার নীরব রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। নব্বই দশকের প্রথম দিকে মোবাইলের যুগ ছিল না। ফেসবুক তো প্রশ্নই আসে না। তখন অচেনা মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বের একমাত্র উপায় ছিল বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের মাধ্যমে পত্রমিতালি। 

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধু সাইদ মমতাজ নামে কোনো এক গ্রামের কলেজপড়ুয়া মেয়ের সঙ্গে পত্রমিতালি করে। মমতাজ একদিন সাইদের সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা আসে। সাইদ তাকে নীরব রেস্টুরেন্টে নিয়ে যায়। সঙ্গে আমাকেও জোর করে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু নীরব রেস্টুরেন্টে ভর্তার খাবার দেখে সেই মমতাজের চোখ কপালে ওঠে। ঢাকায় এসে ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়া...! সাইদের সঙ্গে পরে মমতাজের প্রেম থাক দূরের কথা, পত্র যোগাযোগই বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকার একটা রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন পদের ভর্তা দিয়ে আমার ভাত খাওয়ার অভিজ্ঞতা তো আরও করুণ। গ্রীষ্মের কোনো এক দুপুর। আমি পল্টনের সাপ্তাহিক ছুটি পত্রিকায় একটা গল্প জমা দিতে যাই। ছুটি পত্রিকায় নতুন গল্প জমা দিতে গিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে আগের একটা গল্প ছাপা হওয়ার জন্য একশ’ বিশ টাকার একটা বিল পাই। তখন ছিল মাসের প্রায় শেষ। এখন একশ’ বিশ টাকা তেমন কোনো টাকা না হলেও নব্বই দশকের প্রথম দিকে ছাত্রাবস্থায় মাসের শেষের সেই টাকা আমাদের কাছে অনেক কিছু ছিল।

সাপ্তাহিক ছুটি ম্যাগাজিনের অফিস থেকে একশ’ বিশ টাকা পেয়ে আমি তো খুশিতে আটখানা। সেখান থেকে বের হয়ে ভাবি, কোনো একটা রেস্টুরেন্টে খুব মজা করে খাব। আমাদের সূর্য সেন হলের ক্যান্টিনে সাত টাকার সেই এক বাটি তরকারি আর গামলা ভর্তি ডাল খেতে খেতে পেটে চর পড়ে গিয়েছিল। তাই সুযোগ পেলে ভালো খাবার খাওয়ার লোভ ছিল বেশ। তখন ছিল দুপুর। ক্ষুধায় পেট চনমনও করছিল। সূর্য সেন হলের ক্যান্টিনে গিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ার মতো ধৈর্যও ছিল না। এদিকে পকেটেও বাড়তি একশ’ বিশ টাকা। তাই আমি পল্টনের কবির রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকি। এর আগে আমার কবির রেস্টুরেন্টে খাওয়ার অভিজ্ঞতা মোটেও ছিল না।

কবির রেস্টুরেন্টে ঢুকে ভাবি, আজ ভালো কিছু খাব। ওয়েটার এসে মেন্যুর কথা বলতেই আমি তাকে একটা গলদা চিংড়ির কথা বলি। পকেটে তো বাড়তি একশ’ বিশ টাকা আছেই। ওয়েটার চলে যায়। পর মুহূর্তে সে বাসমতী চালের ভাত ও কয়েক পদের ভর্তা নিয়ে আসে। ভর্তা দেখে আমার চোখ বড় হয়ে ওঠে। আহা বাসমতী চালের ভাতের সঙ্গে ভর্তা!

ভর্তা দিয়ে খেতে না খেতেই ওয়েটার বিশাল এক গলদা চিংড়ি নিয়ে আসে। গলদা চিংড়ির আকার দেখে আমার চোখ আবার বড় হয়ে যায়। আহা এত বড় গলদা চিংড়ি! অসুবিধা নেই। পকেটে তো একশ’ বিশ টাকা বাড়তি আছেই। এর থেকে না হয় বড়জোর চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকাই খসবে। কোনো ব্যাপারই না...!

হলে ফিরতে হবে বলে আমি একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে শেষ করি। ওয়েটারকে বিল নিয়ে আসতে বলি। ওয়েটার সামনের কাউন্টারে বসা ম্যানেজারে কাছ থেকে একটা কাগজে লেখা বিল নিয়ে আসে। বিলের নিচে লেখা দেখি, দুইশ’ আটাশ টাকা...! এরই মধ্য গলদা চিংড়িটার দামই একশ’ ষাট টাকা। আর বাকি বাসমতী চালের ভাত ও ভর্তাগুলোর দাম আটষট্টি টাকা।

আমি বিল দেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকি। পকেট হাতড়ে ওয়ালেটে দেখি, একশ’ বিশ টাকা বাদে আর পঁচিশ টাকার মতো আছে। আর খুচরা কিছু পয়সা। আমি সেই পঁচিশ টাকা ও খুচরা পয়সাগুলো ওয়ালেটে রেখে একশ’ বিশ টাকা নিয়ে কাউন্টারে এগিয়ে যাই। কাউন্টারে ম্যানেজারের সামনে দাঁড়িয়ে একশ’ বিশ টাকা দেওয়ার আগে আমার হাতের ক্যাসিও ঘড়িটা বাড়িয়ে দিই।

ম্যানেজার অবাক হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করে, ঘড়ি?

আমি বলি, জী, ঘড়ি। এটা আমার হাতের ঘড়ি।

: ঘড়ি কেন?

: আপনার রেস্টুরেন্টটা যে এত দামি রেস্টুরেন্ট, সেটা আমি বুঝতে পারিনি।

: সেটা কেমন?

: আমি একটা গলদা চিংড়ি আর কয়েক পদের ভর্তা খেয়েছি। দুইশ’ আটাশ টাকা বিল এসেছে। 
কিন্তু আমার কাছে একশ’ পঁয়তাল্লিশ টাকা আছে। এরই মধ্যে পঁচিশ টাকা আমার হাত খরচের জন্য রাখতে হবে। বাকি একশ’ বিশ টাকা আমি দিতে পারব। তাই সঙ্গে ঘড়িটা দিচ্ছি।

ম্যানেজার এবার হো হো করে হেসে ফেলেন। জিজ্ঞেস করেন, আপনি কী করেন?

আমি বলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি।

ম্যানেজার কী ভেবে একবার মাথা নাড়েন। আমি বুঝতে পারি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনে তার ভেতর একটা শ্রদ্ধা জন্মেছে। তখনকার দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রদের অন্য রকম একটা সম্মান ছিল।

ম্যানেজার বলেন, আপনাকে ঘড়িটা দিতে হবে না। আপনার কাছে যা আছে তাই দিয়ে যান। বাকি টাকা অন্য একদিন দিয়ে যাবেন। না দিলেও সমস্যা নেই।

আমি বলি, না না, অবশ্যই দেব। আমার বাবা ঢাকাতেই থাকেন। মাসের এক তারিখেই আমার খরচের টাকা দেন। আমি হয়তো দু’ তারিখ এসে দিয়ে যাব।

ম্যানেজার প্রসন্ন হেসে বলেন, ওটা আপনার ইচ্ছে।

গল্পটা সাধারণ। অনেকেই হয়তো তাদের জীবনে এ ধরনের পরিস্থিতে পড়েছেন। আমিও যে বিদেশে এসে এমন পরিস্থিতে পড়িনি, তা নয়। এমনও দেখা গেছে, দশ কিলোমিটার গিয়ে সুপার মার্কেটে ট্রলি ভর্তি বিশাল শপিং শেষ করে দেখি ওয়ালেট আনিনি। কোনো পেট্রোলপাম্পে গিয়ে গাড়ির তেল ভরে দেখি সঙ্গে ওয়ালেট নেই। কিন্তু এ গল্পটা এ জন্যই বললাম, এটা বিভিন্ন ভর্তা সম্পর্কিত। যা আমার স্মৃতিতে বিশেষভাবে স্থান করে আসে। হয়তো বিদেশে এসে গত দু’ যুগ ধরে বিভিন্ন নিমন্ত্রণে এত ভর্তার সমারোহ না দেখলে মনে রাখতাম না।

প্রবাসের ব্যস্ততার কারণে সাধারণত আমরা কোনো অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট তারিখ অনুযায়ী করতে পারি না। নির্দিষ্ট তারিখের আগে বা পরে করতে হয়। কিন্তু ভর্তার উৎসবটা আনন্দের হয়েছিল এ জন্য যে উৎসবটা আমরা ঠিক পয়লা বৈশাখের দিনই করতে পেরেছি। আর অনুষ্ঠানে একটা ঘরোয়া পরিবেশ ছিল বলে আমরা প্রতিটি মুহুর্তকে খুবই উপভোগ করেছি।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends